Saturday, 18 April 2015



রবি ঠাকুর

তথাগত মুখোপাধ্যায়





উনি কী মানুষ ছিলেন, না ঠাকুর?

প্রতি বছর, বিশ্বজুড়ে ধুমধাম সহ ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করা হয় এও তো একধরনের পুজো  আর পাঁচটা দেবতা পুজোর সঙ্গে এর তফাত বলতে - অন্যান্য পুজোতে মন্ত্র পড়া হয় - যার স্রষ্ঠা অন্য কেউ রবি ঠাকুরের পুজোতে তাঁর স্মৃতিচারণা তাঁরই সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাঁর গান, তাঁর কবিতা, তাঁর নাটক, তাঁর প্রবন্ধ

শুনেছি রবি ঠাকুরের জন্মস্থান - জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় উৎসব বিপুল জনসমাগম হয় বিশ্বকবির বন্দনা চলে সারাদিন ধরে ধুপধুনো, ফুলমালা, মিষ্টি, জলখাবার - কোনকিছুই বাকী থাকে না

শুধু জোড়াসাঁকো কেন, কলকাতা বা শান্তিনিকেতন ছাড়িয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীর ধুমধাম পৌঁছে গিয়েছে প্রাচ্যে, মার্কিন মূলুকে, ইওরোপ এমনকি আমিরশাহীতেও - যেখানেই বাঙালী, সেখানেই রবীন্দ্রজয়ন্তী

স্কুল জীবনে আমরা মুখিয়ে থাকতাম এই দিনটির জন্যে গরমের ছুটি পড়ে যেত পড়াশুনার চাপ থাকত না ছোটবেলার সেই ছোট্ট মফস্বল - চুঁচুড়া তে - আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকত ছোটকারা ছোটকাদের একতলাতে ছিল একটা হলঘর - মোটামুটি বড় সেই হলে দু - তিনটে চৌকি জোগার করে বানান হতো মঞচ্মা-মাসিদের শাড়ি দিয়ে তৈরী হত ড্রপস্ক্রিন আর উইংস্সে বিস্তর কাজ২৫শে বৈশাখ আসার হপ্তা-দিনদশ আগে থাকতেই ঠাকুরপুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে যেতচাঁদাও তোলা হতবাবা, মাসি, মেসোরা চাঁদা চাইতে গেলে চোখ পাকাতো ঠিকই, তবে দিয়েও দিতসেই টাকা দিয়ে লাইট, মাইক আর মিষ্টি-জলখাবারের বন্দোবস্ত করা হতবলাই বাহুল্য যে বিচিত্রানুষ্ঠান ছিল আমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণঅন্যান্য পাঁচটা অনুষ্ঠানের সঙ্গে এর তফাৎ এই যে এই অনুষ্ঠানের সবই ছিল রবীন্দ্রসৃষ্টরবীন্দ্রনাথ-কে নিয়ে অনুষ্ঠান করার এক মস্ত সুবিধে যে কী করব নিয়ে বেশী মাথা ঘামানোর দরকার নেইঅনুষ্ঠান ভরানোর যাবতীয় উপাদানের বন্দোবস্ত ঠাকুর নিজেই করে গেছেনপ্রেম, পূজা, প্রকৃতি, স্বদেশ, জীবনের এমন কোন পরিস্থিতির কথা ভাবা যাবে না যা নিয়ে কবিগুরু লিখে যাননিঅনুষ্ঠানের প্রথমে সমবেত উদ্বোধনী সংগীত - "হে নূতন দেখা দাও" বা "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে" বা "বিশ্ববীণারবে বিশ্বজনমোহিছে" জাতীয় কোন সংগীততারপর গান, আবৃত্তিসবশেষে, রবীন্দ্রনাথের কোন নাটক বা নৃত্যনাট্যএবং অবশ্যই জলযোগ

 মরা তখন ক্লাস সেভেন-এইটের ছাত্র-ছাত্রীরবীন্দ্রজয়ন্তী শুরু করেছিলাম খুব ছোট করেছোটকাদের একতলার হলঘরেকিন্তু দু-তিন বছর যেতে না যেতেই অনুষ্ঠানটি বেশ বড় আকার ধারণ করলশেষমেশ একবার তো বড়রা আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে স্টেজ-ম্যারাপ বেঁধে বেশ বৃহদাকারে রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠান করে ফেললরীতিমত পেশাদারী মেকআপ আর্টিস্ট্, আলোকচিত্রী, মঞ্চ নির্মাতা ভাড়া করে রমরমা উৎসবপ্রথমে ছোটদের নাটক "ডাকঘর" । তারপর রবি ঠাকুরের নৃত্যনাট্য "শ্যামা" । বড়দের দেখাদেখি তো ছোটরা শেখেআমরা, মানে ছোটরা, কিন্তু আমাদের পাড়াতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর ব্যাপারটা বড়দের মাথায় ঢুকিয়েছিলাম - কথা দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর-জমিদার পরিবারে রবিঠাকুরের জন্ম হয়েছিল ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের ২৫শে বৈশাখ কখনো স্কুলে যাননি - ক্লাশরুমের বদ্ধ কয়েদখানায় বন্দী থাকাতে ছিল তাঁর প্রবল আপত্তি তিনি- পরবর্ত্তী জীবনে শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বের প্রথম মুক্ত-পরিবেশ বিদ্যালয় - যেখানে শিক্ষা প্রদান করা হয় খোলা আকাশের নীচে বিদ্যালয়ের পড়াশুনা বাড়িতেই করেছেন পরে উচ্চশিক্ষার জন্যে বিদেশ গেলেও, দেশে ফিরে এসেছেন শিক্ষা সমাপন না করেই কলেজ বা বিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল না, কিন্তু তাতে কী ? তিনি তো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বা শিক্ষা নেওয়ার জন্য জন্মাননি তাঁর জন্ম হয়েছিল শিক্ষা দেবার জন্য তাঁর লেখা আজও স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির পাঠ্য ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম - ব্রাহ্ম পরিবেশে মানুষ, অথচ তাঁরই লেখনি থেকে বেরিয়েছে শ্যামাসংগীত গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পদ্য, গান, গীতিনাট্য - কী লেখেননি? রবিঠাকুর যত লিখেছেন, আমরা সারাজীবনে ততটা টুকেও শেষ করতে পারবো না স্বাধীনতা সংগ্রামে বার বার সোচ্চার হয়ে উঠেছে তাঁর কলম তাঁর স্বদেশ পর্যায়ের গান আজও উদ্বুদ্ধ করে আমাদের উনি- একমাত্র কবি যার রচনা দু-দুটি দেশের জাতীয়সংগীত উনি ছিলেন একাধারে নট এবং নাট্যকার, গায়ক এবং সংগীতকার স্বরচিত নাটকে অভিনয় করতে প্রায়শই নিজে নেমে পড়তেন মঞ্চে "বাল্মীকি প্রতিভা" তে দস্যু সরদারের ভূমিকাতে অবতীর্ণ হতেন অবলীলায় ওঁর সময় ওঁকে ছাড়া ওই ভূমিকায় আর কাউকে ভাবাই যেত না এত কিছু করেও পিতৄনির্দেশে সমস্ত জমিদারি সামলানর দায়িত্ব ছিল তাঁরই উপর - যদিও এই ব্যাপারে তাঁর ছিল চরম অনাগ্রহ তারপর শান্তিনিকেতন শুরুর দিকে পাঠশালা চালাতেন সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে - এর সমস্ত খরচাও বহন করতেন তিনি-

রবি ঠাকুর তো মানুষ ছিলেন না - উনি ছিলেন এক সমগ্র প্রতিষ্ঠান!  উনি গত হয়েছেন ১৯৪১ খৃষ্টাব্দে ওঁর তিরোধানের এত বছর বাদেও ওঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইন্ডাস্ট্রি ক্রমবর্ধমান

আজ, এই ইন্টারনেট আর হাই-ফাই এর যুগেও, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার সংস্থান করে যাচ্ছেন ওই ঠাকুর

রবি ঠাকুর আমার কাছে কোন মানুষ নন ঠাকুর ! আর রবীন্দ্রজয়ন্তী - ঠাকুর পুজো